ব্রাজিল বাংলা টিভি ডেস্ক:প্রতিবেদন: নিজস্ব প্রতিবেদক

তারিখ: বুধবার, ৫ নভেম্বর ২০২৫

নিউইয়র্ক:
বিশ্ববাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র ও আধুনিক সভ্যতার প্রতীক শহর নিউইয়র্কে নতুন ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন এক তরুণ মুসলিম ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত রাজনীতিক—জোহরান মামদানি। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ছাড়িয়ে এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এই তরুণ নেতা।

প্রথম মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়র

৩৪ বছর বয়সী জোহরান মামদানি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে তিনি হবেন নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম, প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং সবচেয়ে কমবয়সী মেয়র

শৈশব ও পরিবার

১৯৯১ সালের ১৮ অক্টোবর উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় জন্মগ্রহণ করেন জোহরান মামদানি। তার মা বিখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার, আর বাবা মাহমুদ মামদানি একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী। যদিও মাহমুদ মামদানির জন্ম ভারতে, তিনি উগান্ডার নাগরিক।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পরিবারসহ দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান জোহরান; সাত বছর বয়সে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন নিউইয়র্কে। ছোটবেলা থেকেই অভিবাসী জীবনের বৈচিত্র্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন তার ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাধারায় গভীর ছাপ ফেলে।

রাজনীতিতে উত্থান

২০২০ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হন জোহরান মামদানি। এখান থেকেই শুরু তার রাজনীতির যাত্রা। সাধারণ মানুষের সমস্যা—বিশেষ করে ভাড়া, গণপরিবহন ও শিক্ষা নিয়ে সরাসরি মাঠে কাজ করে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।

২০২৪ সালে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেন এই তরুণ রাজনীতিক। শুরুতে তাকে তুলনামূলক অপরিচিত মুখ হিসেবে দেখা হলেও, মাত্র এক বছরের মধ্যেই তিনি নিউইয়র্ক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন।

নির্বাচনী লড়াই ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা

এই নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো ও রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া। প্রাথমিকভাবে বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামসও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু জনসমর্থনের অভাবে সরে দাঁড়ান।

যদিও মামদানি তরুণ ও তুলনামূলক অনভিজ্ঞ, তার প্রচারণা ছিল জনগণের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তার মূল বার্তা ছিল—

“বিশ্ব বদলাতে বয়স বা অভিজ্ঞতা নয়, প্রয়োজন হয় ইচ্ছা আর সততা।”

জনগণের ইস্যুতে জনপ্রিয়তা

তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

স্থায়ী ভাড়ার সীমা নির্ধারণ

গণপরিবহন বিনামূল্যে করা

শিশু যত্নের সার্বজনীন সুবিধা

ধনীদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করে সামাজিক কল্যাণে ব্যয়

এই প্রতিশ্রুতিগুলো বিশেষ করে নিউইয়র্কের শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সরব অবস্থান

জোহরান মামদানি শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সরব কণ্ঠস্বর। গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন ও গণহত্যার বিরুদ্ধে তিনি খোলাখুলিভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন—

“গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত নেতানিয়াহু যদি নিউইয়র্কে আসেন, তবে তাকে গ্রেপ্তার করা উচিত।”

তার এই অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন এবং হুঁশিয়ারি দেন—মামদানি জিতলে নিউইয়র্কের ফেডারেল তহবিল বন্ধ করে দেবেন। তবে এই বিতর্ক তার জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এক নতুন সূচনার ইঙ্গিত

নিউইয়র্ক এখন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনায় দাঁড়িয়ে—যেখানে নেতৃত্ব দেবেন এক তরুণ, প্রগতিশীল ও বৈচিত্র্যময় সমাজের প্রতিনিধি জোহরান মামদানি। তার নেতৃত্বে শহরটি হয়তো আবারও বিশ্বকে দেখাবে, পরিবর্তনের ক্ষমতা মানুষের মধ্যেই নিহিত।